বিয়ের প্রোফাইল কীভাবে লিখবেন, এই প্রশ্ন যাঁরা করেন, তাঁদের বেশিরভাগই ভয় পান যে লেখাটা হয় অহংকারী শোনাবে, নয়তো একঘেয়ে। আসলে দুটোর কোনোটাই দরকার নেই। ভালো প্রোফাইলের কাজ শুধু এটুকু: সঠিক মানুষ আর তাঁর পরিবার যেন বুঝতে পারেন, আপনার সঙ্গে জীবনটা কেমন হতে পারে।
এর জন্য সাহিত্যিক ভাষা লাগে না। লাগে নির্দিষ্ট, সত্যি কিছু তথ্য আর শান্ত, সম্মানজনক সুর। নিচের পরামর্শগুলো যেকোনো ম্যাট্রিমনি সাইটে কাজে লাগবে, আপনি দেশে থাকুন বা বিদেশে।
আগে ভাবুন, পাঠক কী জানতে চান
লেখা শুরুর আগে যিনি প্রোফাইলটা পড়বেন, তাঁর কথা ভাবুন। তিনি ঠিক করছেন আপনাকে জানার জন্য সময় দেবেন কি না। তিনি বুঝতে চান আপনার মূল্যবোধ, আপনার দৈনন্দিন জীবন আর বিয়ে নিয়ে আপনার প্রত্যাশা।
আপনার পড়াশোনা আর পেশা প্রোফাইলের ঘরগুলোতেই থাকে। তাই লেখার অংশে সেটাই দিন, যা ওই ঘরগুলো বলতে পারে না: আপনি কীভাবে সময় কাটান, কী আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, পরিবার নিয়ে আপনি কী ভাবেন।
নিজের সম্পর্কে অংশটা কীভাবে লিখবেন
তিন-চারটি ছোট অনুচ্ছেদই যথেষ্ট। নিজের কথা নিজের মুখে লিখুন, যেন পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় কোনো মুরুব্বির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।
বিশেষণ নয়, উদাহরণ দিন
"আমি সৎ, যত্নশীল ও পরিবারমুখী" লিখলে পাঠক প্রায় কিছুই জানেন না, কারণ প্রায় সবাই এটাই লেখেন। প্রতিটি বিশেষণের বদলে ছোট একটা সত্যি উদাহরণ দিন।
- "পরিবারমুখী" না লিখে: "প্রতি মাসে রাজশাহীতে মা-বাবার কাছে যাই, আর ছোট বোনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কাজে এখনও সাহায্য করি।"
- "পরিশ্রমী" না লিখে: "আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, সাইটের কাজ ভালো লাগে, বর্ষাকালেও।"
- "আড্ডাপ্রিয়" না লিখে: "শুক্রবার স্কুলের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলি, আর আস্তে আস্তে মায়ের হাতের সরষে ইলিশ রান্না শিখছি।"
কয়েকটি বিষয় ছুঁয়ে যান, সংক্ষেপে
ভারসাম্যপূর্ণ পরিচিতিতে সাধারণত থাকে:
- আপনার কাজ বা পড়াশোনা, আর সেটার কোন দিক ভালো লাগে
- আপনার পরিবার, আর তাঁদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক
- ধর্ম আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলে, আপনি কীভাবে তা পালন করেন
- অবসরে কী করেন
- কেমন বিয়ে আর কেমন সংসার গড়তে চান
পাঁচটি নিয়েই বিস্তারিত লেখার দরকার নেই। প্রতিটি নিয়ে এক-দুই বাক্যই আলাপ শুরুর জন্য যথেষ্ট।
সুরটা রাখুন আন্তরিক আর সহজ
লম্বা দাবির তালিকা, অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিযোগ, বা ভুল বোঝার মতো রসিকতা এড়িয়ে চলুন। যেভাবে কথা বলেন, সেভাবে লিখুন। বাংলা বা ইংরেজি, যেটায় আপনি স্বচ্ছন্দ, সেটাই ব্যবহার করুন। দুই ভাষায় ছোট একটা লাইন থাকলে অনেক পাঠক খুশি হন।
আটকে গেলে ভাবুন, প্রোফাইলটা লিখছেন বন্ধুর মায়ের জন্য, যিনি আপনার জন্য পাত্র বা পাত্রী খুঁজতে সাহায্য করছেন। তাহলে সাধারণত উষ্ণতা আর তথ্যের মাত্রাটা ঠিক থাকে।
কেমন জীবনসঙ্গী চান, তা কীভাবে লিখবেন
এই অংশটাই ঠিক করে দেয় কারা সাড়া দেবেন। তাই স্পষ্ট লিখুন, কিন্তু অনমনীয় হবেন না।
আগে লিখুন মূল্যবোধ আর চরিত্রের কথা: সততা, দয়া, পরিবারের সঙ্গে আচরণ, মতের অমিল হলে কীভাবে সামলান। তারপর সেই ব্যবহারিক বিষয়গুলো লিখুন যা সত্যিই আপনার কাছে জরুরি, যেমন ধর্মচর্চা, দেশে না বিদেশে থাকবেন, বা বিয়ের পর চাকরি নিয়ে আপনার মত।
তালিকা ছোট রাখুন। পনেরোটা শর্তওয়ালা বর্ণনা চাকরির বিজ্ঞাপনের মতো লাগে, আর ভালো মানুষেরা পিছিয়ে যান। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, কোন দুই-তিনটি বিষয়ে আপনি কোনোভাবেই ছাড় দেবেন না। সেগুলো বিনয়ের সঙ্গে লিখুন।
চেহারা বা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে শর্ত বাদ দিন, যেমন গায়ের রং, পরিবারের সম্পদ বা জাত, কিংবা এমন উচ্চতার সীমা যা আসলে আপনার কাছে জরুরি নয়। এগুলো জীবনসঙ্গীর চেয়ে লেখকের সম্পর্কেই বেশি বলে, আর মনোযোগী পাঠক তা খেয়াল করেন। যৌতুকের কথা কখনোই লিখবেন না। বাংলাদেশে যৌতুক বেআইনি, আর ইশারায় চাওয়াও অন্যায়।
ছবি বাছাই
ছবি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পেশাদার ফটোগ্রাফারের ছবি লাগবে না।
- গত এক বছরের মধ্যে তোলা ছবি দিন, যেখানে আপনাকে সাধারণ দিনের মতোই দেখায়।
- মুখ যেন স্পষ্ট দেখা যায়, প্রাকৃতিক আলোয়, ভারী ফিল্টার বা সানগ্লাস ছাড়া।
- দৈনন্দিন জীবনের আরও এক-দুটি ছবি দিতে পারেন, যেমন কাজের জায়গায়, শখের কাজে বা বাইরে।
- এমন গ্রুপ ছবি দেবেন না যেখানে আপনাকে আলাদা করে চেনা কঠিন, আর অন্যের ছবি, বিশেষ করে শিশুদের, অনুমতি ছাড়া দেবেন না।
বন্ধনে আপনার ছবি কে দেখতে পাবেন, তা আপনিই ঠিক করেন। তাই স্বস্তি না পাওয়া পর্যন্ত ছবি গোপন রাখতে পারেন। অনেক সদস্য আর অনেক পরিবার এভাবেই পছন্দ করেন।
সৎ থাকুন, কঠিন বিষয়েও
ছোটখাটো বাড়িয়ে বলা, যেমন বেতন বাড়িয়ে লেখা, পুরোনো ছবি দেওয়া, বা আগের বিয়ে নিয়ে অস্পষ্ট উত্তর, প্রায় সবসময়ই পরে ধরা পড়ে। আর তখন সবচেয়ে খারাপ সময়ে বিশ্বাস ভাঙে।
আপনি যদি তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা/বিপত্নীক হন, সন্তান থাকে, দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে এমন কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, বা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে শুরুতেই জানানো ভালো। প্রোফাইলে সব ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। সহজ, তথ্যভিত্তিক একটা লাইনই যথেষ্ট, বিস্তারিত পরে আলাপে হবে।
সততা সাড়াগুলোকেও ছেঁকে দেয়। যাঁরা যোগাযোগ করবেন, তাঁরা মূল বিষয়গুলো জেনেই আগ্রহী, তাতে সবার সময় বাঁচে।
প্রোফাইলে কী দেবেন না
বিয়ের প্রোফাইলের কাজ হলো মানুষকে ঠিক করতে সাহায্য করা, আপনার সঙ্গে কথা বলবেন কি না। অপরিচিত কেউ যেন প্ল্যাটফর্মের বাইরে আপনাকে খুঁজে পান বা যোগাযোগ করেন, সেই সুযোগ দেওয়া এর কাজ নয়।
এগুলো বাদ রাখুন:
- ফোন নম্বর, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ার আইডি
- বাসার ঠিকানা, অফিসের নাম বা কর্মস্থলের সঠিক অবস্থান
- এনআইডি নম্বর বা কোনো কাগজপত্রের ছবি
- পুরো নাম, যদি সাইটে প্রদর্শন নাম ব্যবহারের সুযোগ থাকে
- আয় বা সম্পত্তির এমন তথ্য, যা ভুল মানুষের নজর কাড়তে পারে
কিছুদিন কথা বলার পর মানুষটার ব্যাপারে আস্থা তৈরি হলে তবেই যোগাযোগের তথ্য দিন। কখন সেই সময় এসেছে, তা বোঝার উপায় আছে আমাদের নিরাপদে দেখা করার গাইডে।
প্রকাশের আগে আরেকবার পড়ুন
খসড়া হয়ে গেলে জোরে জোরে পড়ুন। স্লোগানের মতো শোনায় এমন কিছু থাকলে কেটে দিন, বানান দেখে নিন, আর ভাইবোন বা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করুন লেখাটা আপনার মতো শোনাচ্ছে কি না।
তারপর কয়েক মাস পরপর প্রোফাইলটা দেখুন। ছবি, কাজের তথ্য আর পরিকল্পনায় যা বদলেছে তা হালনাগাদ করুন। হালনাগাদ প্রোফাইল পাঠককে বোঝায়, আপনি এখনও আন্তরিকভাবে খুঁজছেন।
শব্দ গোছাতে সাহায্য চাইলে বন্ধনে ঐচ্ছিক এআই লেখা-সহায়তা আছে, যা আপনার প্রোফাইলের লেখা খসড়া করে দিতে বা ঘষেমেজে দিতে পারে। পরে আপনি নিজের মতো করে সম্পাদনা করবেন। প্রস্তুত হলে ছয়টি ছোট ধাপে আপনার প্রোফাইল তৈরি করুন।
সাধারণ প্রশ্ন
বিয়ের প্রোফাইল কত বড় হওয়া উচিত?
নিজের সম্পর্কে অংশের জন্য মোটামুটি ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দই যথেষ্ট। এতে সত্যি উদাহরণ দিয়ে আপনার মূল্যবোধ, পরিবার আর দৈনন্দিন জীবনের কথা বলা যায়, আবার পাঠক শেষ পর্যন্ত পড়েনও। এর নিচে কেমন জীবনসঙ্গী চান, তার ছোট একটা বর্ণনা দিন। লেখা বড় মনে হলে আগে সাধারণ বিশেষণগুলো কাটুন, নির্দিষ্ট তথ্যগুলো রাখুন।
বায়োডাটা বা প্রোফাইলে নিজের সম্পর্কে কী লিখব?
কয়েকটি ছোট অনুচ্ছেদে লিখুন আপনার কাজ বা পড়াশোনা, পরিবার, ধর্ম আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলে কীভাবে পালন করেন, অবসরে কী করেন আর কেমন সংসার চান। "সৎ" বা "যত্নশীল" জাতীয় বিশেষণের বদলে ছোট ছোট সত্যি উদাহরণ দিন। নিজের মুখে লিখুন, সুরটা রাখুন আন্তরিক আর সহজ, যেভাবে মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা বলেন।
বিয়ের প্রোফাইলে কি ফোন নম্বর দেওয়া উচিত?
না। ফোন নম্বর, ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়ার আইডি আর বাসার ঠিকানা প্রোফাইলে দেবেন না। এগুলো দিয়ে অপরিচিত মানুষ প্ল্যাটফর্মের বাইরে আপনাকে খুঁজে পেতে বা যোগাযোগ করতে পারেন, যেখানে আপনার সুরক্ষা কম। আগে সাইটের মেসেজে কথা বলুন। কিছুদিন আলাপের পর মানুষটা আর তাঁর উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আস্থা তৈরি হলে তবেই যোগাযোগের তথ্য দিন।
আগের বিয়ে বা সন্তানের কথা কি প্রোফাইলে লেখা ঠিক?
হ্যাঁ, আর সাধারণত লেখাই ভালো। "আমি তালাকপ্রাপ্ত, আমার ছয় বছরের একটি মেয়ে আছে, সে আমার সঙ্গেই থাকে" এমন ছোট, তথ্যভিত্তিক একটা লাইনই যথেষ্ট। পেছনের গল্প প্রোফাইলে ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। শুরুতেই খোলামেলা থাকলে যাঁরা সাড়া দেবেন, তাঁরা জেনেশুনেই আগ্রহী, তাতে প্রথম আলাপ থেকেই বিশ্বাস তৈরি হয়।